
আক্কাস মুখ হাঁ করে হাই তুলতে গিয়ে গিয়ে দেখল আকাশে একটা কাক উড়ে যাচ্ছে। বিকালে মাঠে একা হাঁটছিল সে। হঠাৎ বন্ধু জাফরের সাথে তার দেখা। তাকে বলল, জানিস একটু আগে যখন আমি হাই তুলছিলাম দেখি উপর দিয়ে একটা কাক উড়ে যাচ্ছে!
জাফরের সাথে সন্ধ্যায় নয়নের দেখা হলো। সে তাকে বলল, জানিস আজকে বিকালে মজার ঘটনা ঘটেছে। আক্কাস হাই তুলতে গিয়ে দেখে মুখের উপর কাক উড়ে যাচ্ছে!
রাতে কারেন্ট চলে যাওয়ার পর নয়ন বাতাস খেতে বাইরে বের হলো। এমন সময় জহিরকে দেখে ডাক দেয়। তাকে বলল, আজকে বিকালে তো অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেছে। আমাদের আক্কাস হাই তুলতে গিয়ে দেখে মুখ ঘেঁষে একটা কাক উড়ে গেছে!
পরেরদিন আক্কাস স্কুলে যাওয়ার পরেই তাকে ঘিরে জটলা বেঁধে গেল। এমন সময় স্যার ঢুকল ক্লাসে। ঝাড়ি মেরে বলল, কী হচ্ছে এখানে?
এক ছেলে এগিয়ে এসে বলল, স্যার তাজ্জব ঘটনা হয়েছে কালকে। আক্কাস হাই দিতে গিয়ে দেখে মুখ থেকে কাক বের হয়ে উড়ে যাচ্ছে!
এই কথা শুনে আক্কাস হতবাক হয়ে গেল! কী ঘটনা কী হয়ে গেছে!
… …
আমাদের মানুষের স্বভাব আসলে এমন। একটা কথাকে বিকৃত করতে করতে এতদূর নিয়ে যাই যে মূল ঘটনার সাথে কোনো মিল থাকে না। এই কারণে কারো মুখের কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে নেই। ইতিহাসের এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো আমরা এখন যেভাবে জানি সেভাবে ঘটে নি। অতীতে গিয়ে যাচাই করার উপায়ও নেই।
তিন ধরনের মানুষ কথা বেশি বিকৃত করে। আবেগপ্রবণ, চাপাবাজ এবং কম স্মৃতিশক্তি যাদের। একজন আবেগপ্রবণ মানুষ ঘটনার সাথে নিজের মতামত আর আবেগ মিশিয়ে কথা বলে। মূল ঘটনা ঠিক থাকে না বেশিরভাগ সময়। একজন চাপাবাজ ঘটনাকে নাটকীয় করে তুলতে বাড়িয়ে বলে অনেক কিছু। নিজের স্বার্থ অনুসারে কথা পাল্টে নেয়। যার অনেককিছু আসলেই ঘটে নি।
মানুষের স্মৃতিশক্তি নিখুঁত নয়। গভীর মনোযোগ না দিলে আমরা যা দেখি বা শুনি হুবহু মনে রাখতে পারি না। পরিসংখানে দেখা গেছে একটু আগে আমরা যা দেখেছি তার ৬২% এর মতো এখন মনে আছে। অর্থাৎ যারা এই লেখা পড়ছেন তারা ইতোমধ্যেই অনেক অংশ ভুলে গেছেন। তাই বেশিরভাগ সময় যেটা হয় আমাদের যতটুকু মনে আছে তার সাথে বাকি অংশ আন্দাজে মিলিয়ে নেই।
তথ্যের বিকৃতি মুখের তুলনায় লেখায় অনেক কম হয়। একটা কাগজ ২০ বার ফটোকপি করলেও লেখা এক থাকে। তাই লিখিত কথাকে আমরা তুলনামূলক বেশি বিশ্বাস করি। তবে ইদানীং লেখার মাধ্যম অনেক সহজ হয়ে যাওয়ায় সবাই লেখক হয়ে যাচ্ছে। গবেষণা করে তথ্য যাচাই করে খুব অল্প পরিমাণ মানুষ। নায়ক রাজ্জাক মারা গেছে শুনেই শত শত পোস্ট হওয়ার পর দেখা যায় উনি জীবিত! মারা গেছে আরেক রাজ্জাক!
আমাদের আসলে একটা ঘটনা শুনে সাথে সাথেই ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। সময় নিয়ে যাচাই করতে হবে আসলে কী হয়েছে।
রক্ত দিয়ে আমরা বাংলা ভাষা অর্জন করেছি। এই বাংলা আসলে কোনটা? নোয়াখালীর বাংলা নাকি বরিশালের? সিলেটের নাকি খুলনার? রংপুরের নাকি চট্টগ্রামের? ঢাকার নাকি ময়মনসিংহের? আগে নাটক সিনেমায় আঞ্চলিক ভাষার এতো আধিক্য ছিল না। বর্তমানে খুব বাজে একটা প্রচলন শুরু হয়ে গেছে। মানুষকে মজা দিয়ে গিয়ে ভাষাকে অপমান করা হচ্ছে। একটা এলাকার ভাষা শুনে যখন আমরা হাসছি সেই এলাকার মানুষগুলোকে কি ছোট করা হচ্ছে না?
মিডিয়ার এই প্রভাব লেখাতে বেশ বড় আকারে পড়েছে। লেখার সময় ইচ্ছামতো ভাষার বিকৃতি চলছে। ব্লগ, ফেসবুক, মেসেজ কিছুই বাদ পড়ছে না। মুখে যাই বলি অন্তত লেখার সময় আমাদের উচিত ভাষাকে ঠিক রাখা। ইংরেজি লেখার সময় কয়েকবার ব্যাকরণ-বানান মিলিয়ে দেখি, কিন্তু বাংলার প্রতি এত অবহেলা কেন! নাকি ফেব্রুয়ারি ছাড়া বাংলার কথা মনে থাকে না!