আমার চিন্তাবেলা-৯

আমার চিন্তাবেলা-৯
তখন ক্লাশ সেভেনে পড়তাম। রমজান ছাড়াও আমরা নিয়মিত নামাজ পড়তাম। আমাদের স্কুলের টিফিন ছিল দুপুর ১:২০ থেকে ২ টা পর্যন্ত। মসজিদে জোহরের জামায়াত হত ১:১৫ থেকে। খেয়ে বা না-খেয়ে কোনোভাবেই গিয়েই জামায়াত ধরতে পারতাম না।

আমি প্রস্তাব দিলাম আমাদের ক্লাশের তো ৭/৮ জন একসাথে যাই, নিজেরাই জামায়াত করব। আলোচনা করে সবাই রাজি হয়ে গেল। দ্রুত টিফিন খেয়ে মসজিদে চলে যেতাম। এতক্ষণে নামাজ শেষ করে সবাই চলে যেত। মসজিদের দোতলা খালি থাকতো। ১:৪০ থেকে আমাদের জামায়াত শুরু হত। আমি ভালো আজান দিতে পারতাম। মুয়াজ্জিন হলাম আমি আর ইমাম হতো আরেকজন।

এক স্যারের কাছে শুনলাম, যে ফেরেশতা মানুষ কীভাবে নামাজ পড়লো তার হিসাব রাখে সে একবারে ১০ এর বেশি গুনতে পারে না। আমরা যদি ১০ জনের বেশি মানুষ মিলে জামায়াত করি তাহলে ফেরেশতা আল্লাহর কাছে রিপোর্ট দেবে যে আমরা এত মানুষ মিলে নামাজ পড়ছি তত সে গুনে শেষ করতে পারে না।

আমাদের আর কে পায়! ক্লাশে অভিযান চালিয়ে আরও কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেলাম। আসতে আসতে ১৪/১৫ জনের বড় জামায়াত শুরু করলাম। পারলে ফেরেশতা গুনে শেষ করুক!
আমরা ধীরে ধীরে ভালো পরিচিতি পেয়ে গেলাম। কেউ ১:১৫ এর মসজিদের জামায়াত ধরতে না পারলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করত। ১:৪০ এ আমাদের সাথে দাঁড়িয়ে যেত।

এর মধ্যে একজন বলল, প্রতিদিন নাকি ২০ জনকে সালাম দিলে নাকি অনেক সুবিধা। সেই দিন যদি কেউ মারা যায় তাহলে শহিদের মর্যাদা পাবে। ক্লাশে এসেই ছেলে-মেয়ে সবাইকে আলাদা আলাদা করে সালাম দিতাম আমরা।

হঠাৎ করে সব ছেলের মাথায় টুপি উঠে গেল। সারা ক্লাশ আমরা টুপি পড়ে থাকতাম। এতে বিপদে পড়ে গেল মেয়েরা। ওদের সাজাসাজি বন্ধ। স্কুল ড্রেসের সাথে বিশাল সাদা ওড়না পেঁচিয়ে আসতে বলা হলো। বোরকা যুগ তখনো সেভাবে শুরু হয় নি।

হাতের লেখা ভালো করার জন্য আমাদের প্রতিদিন ছোট খাতার এক পৃষ্ঠা লিখে আনতে হত বাংলা আর ইসলাম শিক্ষা ক্লাশে। এক ছেলে বুদ্ধি করে ইসলাম শিক্ষা খাতায় বই দেখে আরবিতে হাদিস-আয়াত লিখে আনল। এটা দেখে আমাদেরও পছন্দ হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা। একজন ৫ পৃষ্ঠা আরবি লেখে তো আরেকজন ১০ পৃষ্ঠা। আমি এই রেকর্ড সবার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেলাম। একদিন ৩৫ পৃষ্ঠা, আরেকদিন ৫০ পৃষ্ঠা। দুইদিনে এক খাতা শেষ!

যাদের বাসা কাছে ছিল রাতে তাদের ডেকে নিয়ে এশার নামাজ পড়তাম। নামাজ শেষে মসজিদে বড়োরা হাদিস নিয়ে আলোচনা করতেন। সবাই চলে গেলেও আমি বসে তাদের আলোচনা শুনতাম, আর ভাবতাম। ওই বছর কুরআনও খতম দিলাম। ছয় বছর বয়সের সময় প্রথম শুরু করেছিলাম। অনেকদিন চর্চা না থাকায় আবার নতুন করে শিখতে হয়েছিল।

আমার আব্বা কখনোই এ ব্যাপারে ভালো মন্তব্য করে নি। বলতো এই বয়সে ভণ্ডামি শুরু করেছি। তার মনে মনে সন্দেহ হলো আমি শিবিরের সাথে জড়িয়ে গেছি না। নামাজের সময় কোনো কাজ বাদ দিয়ে নামাজে গেলেও বকা শুনতাম। আমার উৎসাহ আসতে আসতে নষ্ট হয়ে গেল। আমার বোনও আমার দেখাদেখি নামাজের দিকে মনযোগী হয়েছিল। তারও আগ্রহে ভাঁটা পড়ে গেল।

Posted in Uncategorized
Write a comment