আমার চিন্তাবেলা-৮

আমার চিন্তাবেলা-৮

আমার লেখালেখি শুরু হয় ২০০২ সালের শুরুতে। প্রেমে পড়ে মানুষ নাকি কবি হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল। ক্রিকেটের প্রতি প্রেম ছিল অতিমাত্রায়। ক্রিকেট নিয়ে ৪২ লাইনের এক কবিতা লিখে ফেললাম। এরপর থেকে কিছুদিন পর পর কবিতা লিখি; সব ক্রিকেট নিয়ে। জীবনের প্রথম ২০টা কবিতাই ক্রিকেটের।

২০০৩ সালে সিক্সে পড়তাম। আমাদের ক্লাসে নিপু নামের এক মেয়ে তার ছাত্রীজীবন নিয়ে লেখা একটি কবিতা আবৃতি করে শোনায় সবার সামনে। ওর কবিতার প্রতি এক-দুই লাইনে “ছাত্রী” শব্দটা ছিলই। আমরা ছাত্ররা সেদিন ব্যাপক অপমান বোধ করলাম। কবিতা লিখবে ভালো কথা, এতবার ছাত্রী ছাত্রী কেন করতে হবে! ছাত্রদের পক্ষ থেকে কলম ধরলাম আমি। সেদিনই ক্লাসে বসে আমাদের যত ভালো ছাত্র, খারাপ ছাত্র, দুষ্ট ছাত্র, ভদ্র ছাত্র, চালাক ছাত্র, বোকা ছাত্র, মোটা ছাত্র, লম্বা ছাত্র আছে সবার কথা বলে এক বিশাল কবিতা ফেঁদে বসলাম।

কামরুল স্যার আমাদের প্রথম ক্লাস আর শেষ ক্লাস নিতেন। প্রথমে গণিত, শেষে কৃষিশিক্ষা (তখন মেয়েদের জন্য আলাদা গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ছিল না।) নিপু উনার ক্লাসেই ওর কবিতা পড়ে। আমার প্ল্যান ছিল শেষ ক্লাসের আগে লেখা শেষ করে আবার উনাকেই পড়তে দেব। কৃষি পড়ানোর পর স্যার সবার সামনে আমার কবিতা পড়ে শোনালেন। ছাত্ররা তো বেশ ভাবের উপর ছিলাম। একটু পরেই ছুটির ঘণ্টা বাজে। আমরা জয়ী দলের মতো ক্লাস থেকে বের হই।
আমার ছোটবোনকে খ্যাপানোর জন্য কয়েকদিন প্যারডি কবিতা লিখেছিলাম। ও তখন গান শিখত। আমি ছড়া-কবিতা লিখে লিখে বলতাম, “এগুলো সব আমার লেখা। তোর গাওয়া গান সব অন্য মানুষের লেখা!”

২০০৪ সালে কবিতার বিষয়ের পরিবর্তন আসে। গভীর চিন্তা-চেতনার প্রয়োগ শুরু হয়। আমার কাছে কবিতা লিখা যত সোজা লাগত ততই কঠিন লাগত গল্প লেখা। ছন্দ দিয়ে কিছু কথা গুছিয়ে বলতে পারলেই কবিতা দাঁড় করানো যায়। যেহেতু মিথ্যা বলতাম না তাই যে ঘটনা কখনো ঘটে নি সেটা বানিয়ে বানিয়ে কীভাবে গল্প লেখে আমার মাথায় ধরত না। গল্পকারদের আমার জিনিয়াস লেভেলের মানুষ মনে হত।

সেভেনে পড়ার সময় একদিন আমাদের ক্লাসের এক সাধারণ ছেলে রনি দুইটা গল্প লিখে আমাকে দেখাল। তখন মনে মনে ভাবলাম আমি কেন পারবো না! দশ দিনের ভেতরে তিনটা গল্প লিখে ফেললাম। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় ছড়া-কবিতা-প্রবন্ধের চেয়ে আমি ছোটগল্প ভালো লিখতে পারি। তবে আমার একটা রোগ হচ্ছে অনেক কাজ শুরু করে শেষ পর্যন্ত যেতে পারি না। গল্প লিখতে সময় বেশি লাগে। তাই আমার সম্পূর্ণ গল্পের সংখ্যা অনেক কম। অসমাপ্ত গল্প পড়ে আছে বেশ কয়েকটা।

২০০৬ সালের প্রথম আলো-ঐতিহ্য গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় আমি সেরা একশোতে ছিলাম। জাফর ইকবাল স্যারের হাত থেকে সার্টিফিকেট নেয়া, তার সাথে হাত মেলানো, আমাকে কংগ্রাচুলেশন বলা এসব স্মৃতি কখনো ভুলার মতো নয়। আমি ভেবেছিলাম উনার সামনে গিয়ে অনেক কথা বলবো। উনাকে বলবো সব লেখা বাদ দিয়ে হলেও প্রত্যেক বছর যেন “একটুখানি বিজ্ঞানের” মতো একটা করে বই বের করেন। সামনে গিয়ে সালাম দিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। মুখ দিয়ে আর টুঁ শব্দ বের হল না।

২০০৭ ছিল আমার জন্য শেষ সুযোগ। ক্লাস টেনের পরে আর এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া যায় না। এবার আগের চেয়ে বহুগুণ ভালো করে লিখলাম। প্রচুর মুক্তিযুদ্ধের বই ঘেঁটে প্রায় এক মাস সময় লেগেছে এই গল্প লিখতে। এতো বেশি সময় লাগিয়ে ফেলি যে লেখা জমা দেয়ার শেষদিনের আগের বিকালে কুরিয়ার করে পাঠালাম। আমার সাথে মামুন আর আমার ছোটবোনের লেখাও ছিল। আমাদের কারো লেখাই হয়তো সময়মতো পৌঁছে নি।

২০০৮ থেকে আমি, মামুন, রনি মিলে “নবোদয়” নামে একটা ম্যাগাজিন বের করা শুরু করলাম। ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৫ দিন পর পর নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। এই দুই বছর আমি জীবনের সবচেয়ে বেশি লেখালেখি করি। কলেজে বসে ক্লাসের মাঝেও লিখতাম। মাথায় থাকত ১৫ দিনের মধ্যে নতুন সংখ্যা বের করতে হবে। ২০১০ সালের এইচ.এস.সি. পরীক্ষার সময় থেকে আমরা একেকজন একেকদিকে ব্যস্ত হওয়ায় আর ম্যাগাজিনে সময় দিতে পারি নি।

২০১০-এ আমার প্রথম ব্যক্তিগত মোবাইল হয়। যা লেখালেখি হত মেসেজে। একটা কবিতা লিখে পরিচিত সবাইকে পাঠানো। ছোট সাইজের প্রবন্ধ লিখে পাঠানো। চাইনিজ মোবাইল দিয়ে কয়েকদিন ফেসবুক চালিয়ে সাধ মিটে গেল। আবার মেসেজে মন দিলাম। এক বড় ভাই আমার মেসেজ নিয়মিত পড়ত। কয়েকদিন না লিখলে খোঁজ নিত লেখা কোথায়! একদিন সে বলল, সোহান তুমি ব্লগিং করো না কেন?

আমি তাকে বললাম, ভাই আমার না আছে ভালো মোবাইল, না আছে পিসি। সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে বসে থাকবো সেই সুযোগও নেই।

২০১৩ তে শখ করে একবার সামহোয়্যার ইন ব্লগে অ্যাকাউন্ট করেছিলাম বন্ধুর বাসায় বসে। তারপর দুই-তিন মাস বসা হয় নি। সুযোগ পেয়ে একদিন লগইন করতে গিয়ে দেখি আইডি বাতিল।

ভালো টাকা-পয়সা ইনকাম করায় ২০১৪ তে ল্যাপটপ কিনলাম। ইন্টারনেট কানেকশন নিলাম। ব্লগ এতোদিনে নাস্তিক-আস্তিকের পাল্লায় পড়ে মানুষের বিভ্রান্তিতে কালিমাযুক্ত হয়ে গেছে। তাই এখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু সময় পাই ফেসবুকেই দেই। বাংলাদেশের মানুষ ফেসবুককেই ব্লগ বানিয়ে ফেলেছে।

Posted in Uncategorized
Write a comment