আমার চিন্তাবেলা-৭

আমার চিন্তাবেলা-৭

যদি জানতে চাওয়া হয় আমার বয়স কত, আমি তিনটা উত্তর দেবো।

আমার মনের বয়স ১৬ বছর।
আমার শরীরের বয়স ২৪ বছর।
আমার মাথার বয়স ২০০ বছর।

জন্মের পর থেকে ২৪ বছর কেটে গেছে। বেড়ে উঠেছে শরীর। সেই হিসেবে শরীরের বয়স ২৪ বছর বলতেই হয়।

মনের দিক দিয়ে আমি কিশোর রয়ে গেছি। বয়সে যারা বড় তাদের মানসিকতা ভালো লাগে নি। বড় হলে মানুষ ফরমাল হয়ে যায়। কৃত্রিমতা গ্রাস করে। আমার কৃত্রিম হতে ঘোর আপত্তি আছে। বড় হলে নিজের স্বার্থে মানুষকে ঠকানো শিখতে হয়। মেয়ে প্রসঙ্গে বন্ধুদের সাথে বাজে আলোচনা করতে হয়। ভাব নিয়ে চলতে হয়। এগুলো না করলে শুনতে হয়,  Grow up man! কিন্তু আমি বড়দের মতো হতে চাই না। আমি সত্যিই উপলব্ধি করতে পারি growing up is a trap. এসব কারণে বড়দের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো হয় না। তাদের মন জটিলতায় ভরা। সহজেই কোনো ব্যাপার নিয়ে তারা মাইন্ড করে বসে। আর কিছু থাকুক না থাকুক হাতি সাইজের ইগো থাকে। ছোটরা এই দিক দিয়ে অনেক ভালো।

আমি শিক্ষকতা বেছে নিয়েছি তার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আমার ছোটদের সাথে থাকতে ভালো লাগে। তারাও আমার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, কারণ আমি বড়গিরি দেখাই না। আমার ছাত্ররা আমাকে বন্ধুর মতো ভাবতে পারে।

বড় কারো সাথে দেখা হলে আপনার তার সাথে কথা বলার ইচ্ছা না থাকলেও কয়েকটা মুখস্থ লাইন আওড়াতে হবে। আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? বাসায় সবাই ভালো আছে? বেড়াতে আসবেন।

এগুলো সব মুখস্থ কথা। বেশিরভাগ মন থেকে বলা না। না বললে তারা বেয়াদব ভাববে, তাই বলতে হবে। ছোটরা এসব জটিল চিন্তা করে না। তাদের যা মনের কথা, তাই মুখের কথা।
বড় হতে হলে আপনার মুখোশ থাকতে হবে কয়েকটা। বন্ধুদের সামনে একটা পরবেন। পরিবারের সামনে একটা পরবেন। প্রতিবেশির সামনে একটা পরবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটা পরবেন। কর্ম জীবনে আরেকটা পরবেন। ইদানীং ফেসবুকের জন্য এক বা একাধিক মুখোশ রাখা শুরু হয়েছে।

আমি এতো কিছু করতে পারবো না। বড়োরা আমাকে বেয়াদব বলে বলুক। অফিসে বলে আমার কথাবার্তার ঠিক নেই। আমি বিচলিত না। বন্ধুরা ম্যাচিউরিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। চালিয়ে যা। একসময় বিরক্ত হয়ে বলে ঘাড়ত্যাড়া। আমি যুক্তির বাইরে চলছি না। আমি শুধু বড় হতে পারবো না। আমি ছোটই থাকতে চাই। অসামাজিক হলে তাই সই।

এবার আসি মাথার বয়সের কথায়। একজন সাধারণ মানুষের তুলনায় আমি প্রায় দশগুণ বেশি চিন্তা করি। কেউ গেমস খেলে যে সময় কাটায়, আমি তা চিন্তা করে পার করি। মানুষ মুভি দেখে বিনোদনের জন্য। আমি দেখি চিন্তা করার জন্য। বেছে বেছে সেগুলোই দেখি যেগুলো আমাকে চিন্তায় ফেলে দেবে। কয়েকদিন এটা নিয়ে ভেবে জরুরি কোনো আইডিয়া বের করে ফেলতে পারবো। পরিচিত কেউ সমস্যায় পড়েছে, তাকে নিয়ে চিন্তা করতে থাকি। সমাজে, দেশে, পৃথিবীতে অনেক অসঙ্গতি আছে। আমি ভাবতে ভাবতে অনেক কিছুর সমাধান বের করি। পরিচিত মানুষরা কম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে ভাবছে, আমি সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু আনার চেষ্টা করি। ছেলেরা মেয়েদের নিয়ে আলোচনা করে আর মেয়েরা সিরিয়াল নিয়ে কথা বলে দিন পার করে দেয়। আমি তখন ভাবতে থাকি কী করলে পরবর্তী প্রজন্ম এসব বাদ দেবে।

শুধু ভাবলেই তো কাজ হবে না। বাস্তবায়ন করতে হবে। একা বলে সব কাজ করতে পারি না। তখন খুঁজতে থাকি কাকে সাথে নিয়ে শক্তি বাড়াতে পারবো। আমি আমার ছাত্রদের সেভাবেই গড়ে তুলছি। আমি বেঁচে থাকতে হয়তো সব হবে না। আমি মরার পরেও যাতে এই ধারা চলতে থাকে সেই ব্যবস্থা করে রেখে যেতে হবে।

মাথার বয়স শুধু চিন্তার উপর নির্ভর করে না। থাকতে হয় অভিজ্ঞতা। ২৪ বছরে অনেককিছু দেখেছি। তবু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যা আছে সেটা যথেষ্ট না। তাই অন্যদের কাছে অভিজ্ঞতা নেয়ার চেষ্টা করেছি। ৪০ বছরের এক ব্যক্তির কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনে তার অভিজ্ঞতাগুলো নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি। ৪০ বছরে সে যা শিখেছে সব হয়তো শিখত পারবো না। অল্প অল্প করে তার জীবনের সেরা ২/৩ বছর নেয়া সম্ভব। এভাবে বিভিন্ন বয়সের কত মানুষের অভিজ্ঞতা আমি আমার মধ্যে নিয়েছি হিসেব নেই। একজন লেখক সারা জীবন যা শিখেছে তার বড় একটা অংশ জানা সম্ভব যদি তার আত্মজৈবনিক লেখা পড়ি। এভাবে একশোর বেশি মানুষের কাছ থেকে কুঁড়াতে কুঁড়াতে প্রায় ৪০০/৫০০ বছরের অভিজ্ঞতা হবে। সব হয়তো মাথায় নেই। ২০০ বছরের তো থাকবেই।

একজন বিজ্ঞানী-দার্শনিক বহু বছর ভেবে যা বের করছেন, শেয়ার করে তিনি আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। আমি যদি মনোযোগী ও আগ্রহী হই তাহলে কম সময়ে নিজের মধ্যে তা নিতে পারছি।

Posted in Uncategorized
Write a comment