আমার চিন্তাবেলা-৪

আমার চিন্তাবেলা-৪

পশুপাখি নিয়ে আমাদের চিন্তাধারা খুব জটিল পর্যায়ের।

কাউকে আমি যদি বলি বাঘের বাচ্চা, সে দাঁত কেলিয়ে হাসি দেবে। কিন্তু তাকেই যদি ছাগলের বাচ্চা অথবা কুকুরের বাচ্চা বলতাম, সে চোখ রাঙিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসতো। অথচ ছাগল কিংবা কুকুরকেই কিন্তু আমরা আদর করে বাড়িতে পুষি। এরাই বেশ উপকারী। আর সামনে বাঘ দেখলে তো জুতা ফেলে দৌড় দেবো।

এখানে বাঘের সাথে বীরত্ব জড়িত। সেই দিক থেকে ছাগল নিম্ন বুদ্ধির প্রাণী আর বাংলাদেশে কুকুর তো রাস্তার নোংরা প্রাণী।

ক্ষেত্র বিশেষে আমরা এসব প্রাণীদের মানুষের উপরে স্থান দিয়ে ফেলি। যেমন আমেরিকাতে একটা পোষা কুকুরের পেছনে প্রতি মাসে যত খরচ করা হয় তা দিয়ে আমাদের দেশে ২টা মধ্যবিত্ত পরিবার চলতে পারে। “ম্যান অভ স্টিল” সিনেমার একটা দৃশ্য ছিল এমন_ ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে সুপারম্যানের পরিবার। কোনোমতে তারা নিরাপদে চলে আসলেও তাদের প্রিয় কুকুর আটকা পড়ে গাড়ির ভেতরে। পরিচয় গোপন রাখতে সুপারম্যানের পালক পিতা তাকে যেতে দিলো না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেই গেল কুকুরকে বাঁচাতে। কুকুরকে বাঁচাতে পারলেও সে নিজে মারা যায় ঝড়ে।

আমরা ভাবতে পারি এগুলো সেসব দেশের বড়লোকদের খামখেয়ালিপনা। অথবা এসব শুধু সিনেমাতেই হয়। কিন্তু কথাটা আংশিক হলেও পুরোপুরি সত্য নয়। আমাদের দেশের গরিব মানুষও কিন্তু নিজে মরে কুকুর-বিড়াল বাঁচায়। রাস্তায় অনেক ড্রাইভার কুকুর কিংবা ছাগলকে সাইড দিতে গিয়ে গাড়ি গর্তে কিংবা পানিতে ফেলে। সে বেমালুম ভুলে যায় গাড়িতে সে সহ কয়েকজন মানুষ আছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এভাবেই মারা গেছেন ড্রাইভারের ভুলে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে আমরা জানি না কখন বিড়াল বাঁচাতে হবে, আর কখন ইচ্ছা করেই ছাগল মারতে হবে। ২/১ সেকেন্ডের আবেগে মানুষ মেরে ফেলি।

আমার একটা খরগোশ ছিল। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আব্বা বাসায় ফেরার সময় কোত্থেকে জানি কিনে এনেছে। হাতে ছোট একটা পলিথিন; তার মধ্যে খরগোশ। আমরা তো মহাখুশি। উত্তেজনায় কী থেকে কী করি!

প্রথমে একটা ঝুড়ির মধ্যে রাখলেও পরবর্তিতে একে সারা বাসায় ঘুরতে দেয়া হত। আমি ট্রেনিং দিলাম একটা শব্দ করলে যেখানেই থাকুক আমার কাছে ছুটে আসত। টিভিতে দেখতাম খরগোশ গাজর বেশি খায়। প্রকৃতপক্ষে এদের ঘাস বেশি পছন্দ। তবে আমারটাকে শসা-ভাত-মাছ-ডাল যা দিতাম তাই খেতো। খরগোশকে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে গোসল করালে। চামরাছিলা মুরগির মতো দেখায়।

 


ঠিক করলাম ওকে যেদিন আনা হয়েছে ওই তারিখে জন্মদিন পালন করবো। কিন্তু খরগোশ এক বছর থাকবে কিনা তার ঠিক নেই। তাই ভাবলাম প্রতিমাসের ২৮ তারিখেই জন্মদিন হবে। সেই মোতাবেক অক্টোবরের ২৮ তারিখ টিফিনের টাকা দিয়ে ছোট কেক কিনে মোম জ্বালিয়ে জন্মদিন করা হলো।

পরের জন্মদিন নভেম্বরের ২৮ তারিখ আমার বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা ছিল সেদিন। পরীক্ষা শেষে দৌড়ে বাসায় ফিরলাম। এসে শুনি খরগোশ বেশি লাফালাফি করছে দেখে আমার ছোট বোন ওটার গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলো। সবার অনুপস্থিতিতে খরগোশ টানাটানি করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ফেলে। প্রায় মরা মরা অবস্থায় আব্বা দেখে তাড়াতাড়ি দড়ি খোলে। কোনোমতে প্রাণে বাঁচলেও ডান চোখ কোটর থেকে বেড় হয়ে আসে। দেখতে খুব ভয়ঙ্কর অবস্থা। সেদিন একা কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে খরগোশের ছবি একে জন্মদিন করি।

১৫-২০ দিন পরেই চোখ ঠিক আগের মতো হয়ে গেল। আগের মতো খেলায় মেতে উঠলাম। বাসায় মেহমান আসলে রাতে ঘুমের মধ্যে তাদের গায়ের উপর দিয়ে খরগোশ দৌড় দিত। তারা চমকে ভয় পেয়ে যেতো। আমরা খেতে বসলে খাবারের উপর লাফ দিত, তাই খাওয়ার সময় দরজা আঁটকে অন্য ঘরে রাখতাম।

জানুয়ারির ৪ তারিখ। খরগোশ বাইরে ঘাস খাচ্ছিল। আমি গোসল করে বাইরে গিয়ে দেখি কোথাও নেই। আমার ছোটবোন বলে খরগোশ কুকুর কামড় দিয়ে নিয়ে গেছে। আমার সারা দুনিয়া নড়ে উঠলো। শক্ত বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো একটা তলোয়ার ছিল আমার। সেটা নিয়ে বের হলাম। বাড়ি মেরে কুকুরকে মেরেই ফেলবো। কিন্তু রাস্তায় গিয়ে সেই কুকুরকে আর খুঁজে পেলাম না। তন্ন তন্ন করে এদিক-ওদিক ছুটলাম।

এরপর টানা পাঁচদিন প্রতিরাতে একা কাঁদতে কাঁদতে বালিশ চুবিয়ে ফেলতাম। কেউ দেখত না।

যার জন্য কাঁদতাম সে কান্না কী তাই বোঝে না…

Posted in Uncategorized
Write a comment