স্রোতের বিপরীতে

স্রোতের বিপরীতে

 

চাপে ফেলে কি মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছা করানো যায়!

মনোবিজ্ঞানীরা একবার এটা নিয়ে গবেষণা চালায়। একজন মানুষকে কিছু প্রশ্নের উত্তর পড়তে দেয়া হবে। এরপর তাকে একটা করে প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করা হবে। উত্তর ঠিক হলে ভালো। কিন্তু ভুল করলে প্রত্যেক ভুলের জন্য তাকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হবে। তাই তার কাজ হচ্ছে যেভাবেই হোক উত্তর মনে রাখা। এই এক্সপেরিমেন্টের নাম ছিল ‘মিলগ্রাম ইলেকট্রিক শক এক্সপেরিমেন্ট’।
একটি মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য কিছু লোক লাগবে, পত্রিকায় এমন বিজ্ঞাপন দেখে বেশ কয়েকজন উৎসুক লোক চলে আসল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বয়স ও পেশার ১২ জনকে নেয়া হলো। ২ জন করে গ্রুপ করা হলো। একজন প্রশ্নের উত্তর দেবে ও শক খাবে, আরেকজন প্রশ্ন ধরবে ও শক দেবে!

কেউ কি আর এসব শুনে শক খেতে চায়! তাই লটারি করা হলো। যার ভাগ্যে যেটা পড়ে।

লটারি শেষে যথারীতি কাজ শুরু হলো। যে উত্তর দেবে তাকে ২০০ টি সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করতে বলা হলো মাত্র আধা ঘণ্টা সময়ের মধ্যে।

ওদিকে যে প্রশ্ন করবে তাকে বোঝানো হচ্ছে কীভাবে কী করবে। প্রশ্ন করার পরে এ, বি, সি, ডি চারটি অপশন বলবে। ওপাশ থেকে বাটন চেপে উত্তর দেবে। উত্তর ভুল হলে এখান থেকে এক সেকেন্ডের শক দেবে। প্রথম ভুলের জন্য ১৫ ভোল্টের শক। দ্বিতীয় ভুলের জন্য ৩০ ভোল্ট। এভাবে প্রত্যেক ভুলের জন্য ১৫ ভোল্ট করে বাড়তে থাকবে। সর্বোচ্চ ৩০তম ভুলের জন্য ৪৫০ ভোল্ট। শক খেতে কেমন লাগবে দেখানোর জন্য তাকে কম ভোল্টের একটা শক দিয়েও দেখানো হলো।

শুকনো হাতে মানুষ ৫০ ভোল্টের নিচের শক তেমন টের পায় না। আর ভেজা হাতে ১০ ভোল্ট থেকে শক খাওয়া শুরু করে। এখানে হাত শুকনোই ছিল। তবে ৪৫০ ভোল্ট মানে বিশাল কিছু। অসাবধানতায় অনেকেই বাসায় শক খেয়েছেন নিশ্চয়ই। আমিও ২ বার খেয়েছি। সেটা মোটেই সুখের না। এমন ঝাটকা সারা জীবন মনে থাকে। আমাদের দেশে বাসায় যে বিদ্যুৎ থাকে সেটা ২২০ ভোল্টের মতো। তাহলে কল্পনা করুন ৪৫০ ভোল্ট কী ভয়ঙ্কর জিনিস!

এই পর্যায়ে আপনার মনে হতে পারে এমন অমানবিক পরীক্ষা তারা কীভাবে করতে পারে! আসলে ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। ওই প্রান্তের ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কোনো শকই খায় নি। কারণ যে ১২ জনকে নেয়া হয়েছে তাদের বোকা বানানো হয়েছে। শক খাওয়ার অভিনয় করার জন্য একজন অভিনেতাকে বিজ্ঞানীরা আগেই এনে রেখেছে। লটারির ব্যাপারটাও ছিল চালাকি। এমনভাবেই সাজানো হয়েছে যেন সেই ১২ জনেরই প্রশ্ন ধরে শক দিতে হয়।

তাহলে এক্সপেরিমেন্ট রইল কোথায়! এখানেই মজা। চাপে ফেলে যা ইচ্ছা করানো যায় কিনা পরীক্ষা হবে তাদের উপর। অপর প্রান্তের লোক কয়েকটা শকের পর চিৎকার চেচামেচি শুরু করবে। সে বলবে তাকে এই নরক থেকে বের করতে। এই অবস্থায় তারা পুরোপুরি উপলব্ধি করবে কাজটা আসলে অমানবিক হচ্ছে। কেউ আর সামনে এগোতে চাইবে না। কিন্তু বিজ্ঞানী তাকে বোঝাবে বিজ্ঞানের বড় কাজের স্বার্থে একজনকে কষ্ট করতে হতেই পারে। এতে হাজার হাজার মানুষের উপকার হবে। তাকে করতেই হবে। তখন তারা করবে কিনা সেটাই দেখা হবে। তারা আরও শক দিলে কিছুক্ষণ পর লোকটা উত্তর দেয়াই বন্ধ করে দেবে। যেহেতু তাকে দেখা যাচ্ছে না, সবাই ভাববে মারা গেল নাকি। এই অবস্থায় কেউই আর আগে যেতে রাজি হবে না। তখন বিজ্ঞানী তাকে বোঝাবে এক সেকেন্ডের শকে কেউ মারা যাবে না। বড়জোর অজ্ঞান হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তো আর পাওয়া যাচ্ছে না। বিজ্ঞানী বলবে উত্তর না দিলে সেটা ভুল উত্তর ধরে নিয়ে শক দিতে হবে।

কী মনেহয়? কতজন কতদূর যাবে?

বিস্ময়কর হলেও সত্যি ১২ জনের মধ্যে ৯ জনই ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত গিয়ে শেষ করে।

এখানে কয়েকজনের পরিসংখ্যান তুলে ধরি।

৫৩ বছর বয়সের এক পুরুষ পিয়ানোবাদক- শুরুর দিকেই মানা করে দেয়। বিজ্ঞানীর চাপে পড়ে আবার শুরু করে। মাঝামাঝি এক পর্যায়ে এসে সে চেয়ার থেকে উঠে পড়ে। কিছুতেই সে এ অমানবিক কাজ করবে না। বিজ্ঞানী তাকে দিয়ে আর করাতেই পারে নি।

৪১ বছরের এক মহিলা প্রশিক্ষক- একটু পর পর করতে আপত্তি জানাচ্ছিল আর বিজ্ঞানী প্রত্যেকবার গম্ভীরভাবে তাকে করে যেতে বলে। বার বার এই এমন করতে করতে শেষ পর্যায়ে গেল সে।

১৯ বছরের এক জীববিজ্ঞানের ছাত্রী- সে বেশ মজাই পাচ্ছিল। যতই চেচামেচি করে কোনো পাত্তা দেয় না। এক পর্যায়ে যখন দেখল আর উত্তর আসে না তখন চিন্তায় পড়ে গেল। হাসি দিয়ে বলল, আমরা কি তাকে মেরে ফেললাম! বিজ্ঞানী বলে, মরার তো কথা না। চালিয়ে যান। এরপর দিগুণ উৎসাহে প্রশ্ন করে শক ৪৫০ ভোল্ট পর্যন্ত গেল।

২৬ বছর বয়সের পুরুষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা- তার মন করতে সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানীর মুখের উপর মানা করে দেবে সেই মানসিক জোরও ছিল না।

এক বৃদ্ধ মহিলা- মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই শেষ পর্যন্ত গেল।

দুই মধ্যবয়স্ক মহিলা- প্রথম দিকে উৎসাহী ছিল। পরে বুঝল কাজটা ভালো হচ্ছে না। কিন্তু চাপে পড়ে স্বাভাবিকভাবেই শেষ করল।

 

 

এক তরুণ- চাপে পড়ে ৪৫০ পর্যন্ত গিয়ে ভেঙে পড়ল। মাথায় হাত দিয়ে হাঁ-হুতাশ করে উঠল এটা সে কী করল!

কামেরায় এদের সবার কর্মকাণ্ড ও মুখের ভঙ্গি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা হলো। দেখা গেল পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি ফরমাল। তাদের নিয়মের মধ্যে থাকার প্রবণতা বেশি। কেউ জোরালোভাবে বিজ্ঞানীকে মানা করে নি। ছেলেদের আবার চাপ নেয়ার ক্ষমতা কম। কারোই মুড ভালো ছিল না পুরোটা সময়।

পরীক্ষা শেষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই শক খাওয়া ব্যক্তি হেসে হাজির হলো। এটা দেখে তারাই মানসিক শক খেল! বিজ্ঞানী রহস্য প্রকাশ করল যে আসলে এক্সপেরিমেন্ট তাদের উপরেই হয়েছে। এটা শুনে যারা শেষ করেছিল তারা বেশ লজ্জা পায়। আর যারা শেষ করে নি তারা বেশ খুশি হয়।

এই হচ্ছে মানুষের স্বভাব। আমাদের সারাটা জীবন আসলে এমন। পরিবারের চাপ, সমাজের চাপ, বন্ধুদের চাপ, পড়ার চাপ, কাজের চাপ আরও নানান চাপে পড়ে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অনেক কিছু করে যাচ্ছি। মানবতা, নিজের স্বপ্ন উপেক্ষা করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। ঠকাচ্ছি, কষ্ট দিচ্ছি অন্যদের। জীবনের শেষে এসে যখন বুঝবো আমরা কত বোকা আর অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলাম তখন লজ্জা পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

কিছু মানুষ চাপ উপেক্ষা করে স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার সাহস দেখায়। শেষ জীবনে প্রাপ্তির খাতা দেখে আত্মসন্তুষ্টিতে মন ভরে যায়।

আর মনে মনে ভাবে, হ্যাঁ আমি পেরেছি!

Posted in Blog, Mobile, MusicTags:
Write a comment