বানান আন্দোলন

বানান আন্দোলন
এই পোস্ট পড়ার পর অনেকে মনে মনে গালি দিতে পারেন। এতদিন হয়তো গালি দিয়েছেন, কিন্তু জানতেন না যে গালিটা আমার খাওয়ার কথা।
আমার একটা অভ্যাস হচ্ছে যখন কোনো গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, আইডিয়া বা উদ্দেশ্য পছন্দ হয় সেটাতে প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। ফেসবুকে একাধিক গ্রুপ আছে যেগুলোতে আমি এক সময় এত সময় দিয়েছি যে অনেকে আমাকে সেগুলোর অ্যাডমিন ভাবতো। আসলে অন টপিক চালু করার আগে আমি চাইতামও না কোনো গ্রুপের অ্যাডমিন হতে। তাই মেম্বার হিসেবে কাজ করে গিয়েছি।
সম্প্রতি ফেসবুকের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত গ্রুপ “বানান আন্দোলন।” ওয়াহেদ সবুজ প্রায় ৩ বছর আগে এই গ্রুপটা চালু করে। এত বছর একাই টেনে নিয়ে গিয়েছেন। বানান সচেতনতা নিয়ে শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ), বানান শুদ্ধকারী (বাশু) গ্রুপ দুটো অনেক বছর ধরেই কাজ করছে। তারা আয়তনে বানান আন্দোলনের চেয়ে অনেক বড়ো। তাই বানান আন্দোলন আড়ালেই পড়ে ছিল।
এ বছর মে মাসের শুরুতে রেজবুল ইসলাম ও ওয়াহেদ সবুজ মিলে সিদ্ধান্ত নেয় বানান আন্দোলন গ্রুপটাকে নিয়ে আরও বড়ো কাজ করার। রেজবুল ভাইয়ের সাথে অনেক আগে থেকেই নানান উদ্যোগ নিয়ে কথা হতো। যেহেতু বানান চর্চা আমার একটা পছন্দের বিষয় তাই স্বেচ্ছায় গ্রুপে সময় দেওয়া শুরু করি। বিভিন্ন টপিকে পোস্ট দিতাম। কেউ প্রশ্ন করলে কমেন্টে উত্তর দিতাম।
একদিন ভয়েস কলে রেজবুল ভাইয়ের সাথে প্রায় ঘণ্টাখানেক কথা হলো গ্রুপের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তখন তাকে আইডিয়া দিলাম “হ্যাশট্যাগ বানান আন্দোলন” এর। এতে করে গ্রুপের নামটা গ্রুপের বাইরেও ছড়াবে। সবুজ ভাইয়ের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলবে জানালো। কিন্তু গ্রুপে এমন কোনো কার্যক্রম দেখলাম না। যেহেতু আমি অ্যাডমিন না তাই অফিশিয়ালি গ্রুপে সেটা বলতে পারি না। কমেন্টে কয়েকজনকে বললাম কোথায় ভুল বানান পেলে সেখানে শুদ্ধ করে #বানান_আন্দোলন লিখে দিতে। যেহেতু নামটা আন্দোলন তাই এটা করা যায়। সবুজ ভাই এসব কমেন্ট খেয়াল করলেন। তারপর একদিন দেখি গ্রুপে উনার অফিশিয়াল ঘোষণা “হ্যাশট্যাগ বানান আন্দোলন।” সাথে ১ মাসের সময় বেঁধে দিয়ে পুরস্কারও ঘোষণা করলেন। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত চললো এই কার্যক্রম।
আমরা যেটা কল্পনা করেছি তারচেয়ে অনেক বেশি সাড়া ফেলে দিলো। ভেবেছিলাম সবাই বিখ্যাত পেজ ও পোর্টালের বানান ভুল ধরে গ্রুপে পোস্ট দিবে। সাথে ব্যক্তিগত ক্লোজ কিছু মানুষের। কিন্তু বাঙালি একবার ক্ষেপে গেলে সেটার ১৪ গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ে। চেনা-অচেনা সবার বানান ভুল ধরতে থাকলো। ইনবক্সে পর্যন্ত বানান আন্দোলন চললো। এক ছেলে তো ইদের আগে মেহেদি দিয়ে হাতে ‘বানান আন্দোলন’ লিখে ফেলেছে। কতটা ক্রেজি হলে এটা সম্ভব!
এরপরের ঘটনা আপনারা জানেন। ব্যাপারটা মহামারি আকার ধারণ করলো। এমনিতে এক মহামারি চলছে, তার ওপর অনলাইনে আরেক মহামারি। মানুষ করোনা কী ভয় পাবে, তারচেয়ে বেশি ভয় পাওয়া শুরু করেছে কে যেন এসে তার বানান ভুল ধরে বসলো। ফেসবুকে করোনার ভয় রিপ্লেস হয়ে গেল বানান আন্দোলনের ভয়ে।
১ মাস পর অফিশিয়াল হ্যাশট্যাগ আন্দোলন বন্ধ হলেও মানুষ এটায় পৈশাচিক মজা পেয়ে গেছে। কিছুতেই আর এই জিনিস থামছে না। গ্রুপে ৩ বছরে মেম্বার হয়েছিলো ৩ হাজার। সেখানে এখন ২ মাসে হয়ে গেছে ৪০ হাজার। ১ লাখ হলে ধুমধাম করে উদযাপন করা হবে।
মানুষ এখন যতই এটার বিরুদ্ধে পোস্ট করবে, এটার মার্কেটিং হতে থাকবে। তাই হচ্ছে। মানুষ শত শত বানান ভুল করে আসছে সারা জীবন। তাই কন্টেন্টেরও অভাব পড়বে না কখনও।
লোকজন এখন যতই বিরক্ত হোক, এটার একটা সুফল আসবে কয়েক বছরের মধ্যে। আগে কেউ বানান শুদ্ধ রাখার ব্যাপারটা পাত্তা দিতো না। এখন না চাইলেও তার মনে এটা গেঁথে যাবে। ইদ বা গোরু দেখতে অস্বাভাবিক লাগে কারণ আগে মানুষ দেখেনি। এখন এটার বিরুদ্ধে হাজার হাজার পোস্ট দেখেও এসব বানান তার পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। আপনি যতবার গোরু বানান নিয়ে ট্রল করছেন ততবারই গোরু বানানটা দেখছেন।
এবার কুরবানির ইদে মানুষ ঠিকই গোরু খাবে। যারা এবার খাবে না তারা পরের বছর খাবে। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ৯০ বছর গরু খাইয়ে গেছে, সেভাবে এখন প্রতি বছর গোরু খাদকের সংখ্যা বাড়বে।
Posted in Uncategorized
Write a comment