আমার চিন্তাবেলা-১০

আমার চিন্তাবেলা-১০

মোবাইলে এমন একটা মেসেজ পেয়েছেন কখনো?

“প্লিজ পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করুন,
নিরাপদে পথ চলুন।”

২০১০ থেকে এখন পর্যন্ত এই কথাটা প্রায় ৫০ হাজার নাম্বারে পাঠিয়েছি। হয়তো আপনার বা আপনার পরিচিত কারো কাছে গিয়েছে।

আমার প্রথম ব্যক্তিগত মোবাইল হয় ২০১০ সালে। ভাবলাম এটার একটা ভালো ব্যবহার করি। মোবাইল কোম্পানিগুলো তখন সারাদিন অমুক অফার তমুক অফার দিয়ে মেসেজ পাঠাতো না। আমার মনে হলো কেউ যদি নিজের মোবাইলে একটা মেসেজ পায় এক-দুই মিনিট হলেও সেটা নিয়ে ভাববে। একশোজনের মধ্যে একজন সচেতন হতে পারে। সেটা একদিনের জন্যও হতে পারে। অল্প যাই হবে সেটাই সার্থকতা। আমরা সবাই জানি এসব মানা উচিত। কিন্তু মনে থাকে না। মনে করানোর কাজটা করলাম।

৫০০ মেসেজের বান্ডেল কিনে এক-দুইদিনের মধ্যে শেষ করে ফেলতাম। এর জন্য খুব যে আলাদা সময় দিতে হয় তাও না। রাস্তায় জ্যামে পড়ে গাড়িতে বসেও পাঠানো যায়। টিভিতে খেলা দেখতে দেখতেও পাঠানো যায়। গান শুনতে শুনতেও করা যায়। এরকম আরও সময় পাওয়া যায়।

মেসেজের নিচে লিখে দেই আমি তাকে চিনি না, ফোন না দেয়ার জন্য। তবুও অনেকে ফোন দেয়। কেউ কেউ রিপ্লাই মেসেজ দেয়। এতে দেশের মানুষ সম্পর্কে আমার ভালো একটা ধারণাও হলো। বুঝতে পারলাম কত মানুষ অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কত মানুষ কেমন গালাগালি করতে পারে, কত মানুষ মেসেজ পড়তে পারে না, কোন জেলায় মোবাইল বেশি ব্যবহার করে, মানুষের কী পরিমাণ বন্ধ সিম, কতজন মিসকল দিতে পটু, কত মানুষ সন্দেহপ্রবণ ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকের ঝাড়ি খেয়েছি কিন্তু প্রচুর উৎসাহও পেয়েছি অনেকের কাছে, তাই বন্ধ করি নি। কারো কারো সন্দেহ ছিল আমি মেয়ে খুঁজতে এই কাজ করেছি। কোনো মেয়ে হলে বলতো আমি যেন তার নাম্বারে আর মেসেজ না দেই। আসলে তাদের নাম্বার আমার কাছে থাকত না। মেসেজ আন্দাজে পাঠাতাম।

কেউ কেউ যোগাযোগ রাখতে চায়। ধীরে ধীরে সারা দেশের অধিকাংশ জেলার মানুষের সাথে পরিচয় হলো। কৃষক, দোকানদার, ভার্সিটির টিচার, ছাত্র, গাড়ি চালক, মাস্তান, হুজুর আরও বহু ধরনের ও পেশার মানুষ। এর মধ্যে ১২ বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধ আছে। ছেলে আছে, মেয়ে আছে। কারো সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হলো।
সাতক্ষীরার এক ভ্যান চালক তার পরিবারের সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়েছে। লোকটা খুব ভালো। কয়েকবছর ধরেই বলছে আমি যেন আমার একটা ছবি পাঠাই। আমার ছবি প্রিন্ট করাও হয় না, পাঠানোও হয় না। তার ছেলে আমার লিস্টেই আছে। কলেজ শেষ করে কিছুদিন আগে বিদেশে গেছে।

আমার সমবয়সী একজনের সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। দেখা তেমন হয় না। তবে জন্মদিনে বা ঈদে একজন আরেকজনকে গিফট করি।

 

সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হয়েছে নাটোরের এক দোকানদারের সাথে। তার দুইটা জমজ ছেলে-মেয়ে আছে। সে তার পারিবারিক সব কথা আমার সাথে বলে। সমস্যায় পড়লে আলোচনা করে পরামর্শ নেয়। একবার বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে। আমার কথায় রাতে ফুল নিয়ে বাসায় ফেরে। আমার সাথে পরিচয় হওয়ার আগে নিয়মিত সিগারেট খেত। আমি বললাম, সিগারেট কেন খাও?

আমাকে বলে- কেউ তো কখনো বলে নি আমার জন্য সিগারেট ছেড়ে দাও।

– আমি বলছি আমার জন্য সিগারেট ছাড়।

– একদিনে তো ছাড়তে পারবো না। তবে কথা দিচ্ছি আসতে আসতে কমিয়ে আনবো।

সে তার কথা রাখে। তিন-চার মাসে সিগারেট সম্পূর্ণ ছেড়ে দেয়। গত চার বছর ধরে আর সিগারেট খায় না। প্রথম দিকে বিশেষ উপলক্ষে বন্ধুদের চাপে পড়ে খেত। আমার কথায় সেটাও বাদ দিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের এখনো কোনোদিন দেখা হয় নি। ঢাকায় তিনবার এসেছিল খুব কম সময়ের জন্য। আমার আর তার সময় না মেলায় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে প্রত্যেকবার।

দুইজন মেয়ে আর তিনজন বড় ভাইয়ের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। তিনজন বিয়ের পর থেকে আর দুইজন অজানা কারণে লাপাত্তা। কারো নাম্বার চেঞ্জ, কেউ রিসিভ করে না।

Posted in Uncategorized
Write a comment