
আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র আমি মুসলিম না। তবে ছোটদের সবসময় আমি ইসলাম অনুসরণ করতে উৎসাহিত করি।
ব্যাপারটা একটু খোলাসা করা জরুরি।
আমার মধ্যে অল্প-বিস্তর যেটুকুই ভালো গুণ আছে তার প্রায় সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ইসলামের। ক্লাস সেভেনে একটা হাদিস পড়লাম_ “যুদ্ধক্ষেত্রে যে জয়ী হয় সে প্রকৃত বীর নয়, প্রকৃত বীর সেই যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
কিশোর বয়সে মানুষ খুব অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় হয়। নিজেকে সুপারহিরোদের মতো ভাবতে ভালো লাগে। এরকম একটা সময়ে যখন এমন একটা হাদিস পড়লাম আমার ভেতর নাড়া দিয়ে উঠলো। প্রতিদিন ২ ঘণ্টা ব্যায়াম করে কী কচু হবে! প্রকৃত বীর হতে গেলে রাগ দমিয়ে রাখতে হবে। এরপর থেকে আমার এক বন্ধুকে বলতাম- পারলে তুই আমাকে রাগিয়ে দেখা। যেভাবে পারিস!
সে আমাকে নানানভাবে রাগানোর চেষ্টা করতো। আমি রাগতাম না। আমার জন্য এটা চ্যালেঞ্জ ছিল। এভাবে আমার রাগ না করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। (২০১২ সালে যখন কোচিংয়ে পড়ানো শুরু করলাম তখন দেখি ছেলে-মেয়েরা আমাকে ভয় পায় না। দেখলাম কিছুটা রাগ আনা জরুরি এই পেশায়। তখন আবার রাগ আনলাম নিজের মধ্যে।)
ছোটবেলা থেকে আমি শুনে এসেছি ইসলামে মিথ্যা বলা মহাপাপ। মহাপাপ হচ্ছে সবচেয়ে বড় ধরনের পাপ। মিথ্যাকে শত্রু বানিয়ে ফেললাম। জীবনে কয়টা মিথ্যা বলেছি সময়সহ গুণে বলে দিতে পারবো। ঘনিষ্ঠ সবাই আমাকে প্রচুর বিশ্বাস করে। আমার ছোটবোন আমার কাছ থেকে এই গুণ পেয়েছে। আমার চেয়ে বরং এককাঠি বেশি সরেস। ওর একসময় মুদ্রাদোষ ছিল প্রত্যেক লাইনে লাইনে “মনেহয়” বলত। ভুলেও যাতে মিথ্যা বলা না হয়ে যায়।
কুরআনে বলা আছে- “ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পূর্ববর্তী লোকেরা ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।” যত দিন যায় আমি বুঝতে পারি এই কথাটার ওজন কত বেশি! এরপর থেকে কোনো ব্যাপারে ধারণা করে চলা বাদ দিলাম। প্রায় সবাই ধারণার উপরে চলে। নিজে যা ধারণা করে সেটাই মনে করে ঠিক। কারো সাথে আলোচনা করতে চায় না। আস্তিক-নাস্তিক সবার মধ্যে এই গোঁড়ামি আছে। ধর্ম ছাড়াও বহু ব্যাপারে মানুষ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। সাইকোলজিক্যালভাবেও এর প্রমাণ আছে।
গিবত সম্পর্কিত হাদিসটার কথা প্রায় সবাই জানে। খুব কঠিন ব্যাপার, তবু এটা শোনার পর থেকে আমি চেষ্টা করি কারো খারাপ কিছু বললে যেন তার সামনেই বলি। এতে সে সম্পর্ক ভালো না রাখলে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারো সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার চেয়ে সত্যের সাথে সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা বেশি জরুরি।
মুনাফেকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। এরা ইসলামের শত্রু কাফেরদের চেয়েও খারাপ। মুনাফেক কারা? যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না; প্রতারণা করে; আমানতের খেয়ানত করে; দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে; মিথ্যা বলে। আমি সাবধান হয়ে গেলাম কথা দিয়ে কথা রাখার ব্যাপারে। সব কথা মনে রাখার চেষ্টা করতাম। এতে আরেকটা উপকার হয়েছে, আমার স্মরণশক্তি ভালো হয়েছে।

অনেক জাল হাদিসের ভিড়ে এটা আসলে হাদিস কিনা নিশ্চিত না, কিন্তু আমি হাদিস হিসেবেই শুনেছি -“সৃষ্টি নিয়ে এক ঘণ্টা চিন্তা করা সত্তর বছর ইবাদতের চেয়ে উত্তম।” এই কথাটা আমাকে মুক্তচিন্তা করতে অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
মহানবি কেমন ছিলেন সেটা ইতিহাস ঘেঁটে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না। তাই আমি অতীত ঘাঁটতে আগ্রহী না। তবে তার যে ভালো গুণগুলোর কথা প্রচলিত এবং ছোটবেলায় আমরা গল্প হিসেবে শুনেছি সেগুলো আমাকে অনেক প্রভাবিত করেছে। তিনি তার শত্রুকে শুধু ক্ষমাই করতেন না, সুযোগ পেলে তাদের উপকারও করতেন। এসব শুনে আমি ভালো কাজের ব্যাপারে অনেক উৎসাহ পেয়েছি।
বুখারি শরিফের প্রথম হাদিস, “নিয়তের উপর কর্মফল নির্ভর করে।” আমার উদ্দেশ্য যদি ভালো থাকে তার পুরস্কার একসময় আমি পাবো। বিপরীত হলে শাস্তিও পাবো। এই হাদিসটা আমাকে মন পরিষ্কার রাখার মেসেজ দিয়েছে। অনেক কাজে অনেকে যোগ্য সম্মান দেয় নি। আমি নিজেকে বুঝিয়েছি আমার উদ্দেশ্য তো ভালো ছিল।
কয়েকটা হাদিসে বলা হয়েছে- “বিদ্বানের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে দামি।”
“মূর্খের ইবাদতের চেয়ে জ্ঞানীর ঘুম শ্রেয়।”
এরচেয়ে বেশি সম্মান কোথায় দেয়া হয়েছে জ্ঞানী ব্যক্তিদের?
মনোবিজ্ঞান বলে মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল কাঠামো তৈরি হয় ১৫ বছর বয়সের মধ্যে। এরপর শুধু অভিজ্ঞতা বাড়ে।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে করি প্রত্যেক মানুষকে ১৫ বছর পর্যন্ত ইসলামের ছায়ায় রাখা উচিত। (সরাসরি ইসলাম মানে কুরআন-হাদিস; তথাকথিত মুসলিমদের অধীন না যারা নিজেই ইসলাম জানে না।) প্রথমে সুন্দর চরিত্র গঠিত হোক। এরপরে সে আস্তিক-নাস্তিক কী হবে তার ব্যাপার।