
আধা ঘণ্টা কষ্ট করে আপনি একটা অংক করার চেষ্টা করলেন কিন্তু উত্তর মেলাতে পারলেন না। পরীক্ষায় হয়তো আপনি নম্বর পাবেন না। স্যারের বকাও শুনতে পারেন। বাবা-মা মনঃক্ষুণ্ণ। আপনি হতাশ।
আবার আপনার এক বন্ধু অংকটা পারে। তার নোট খাতা দেখে পাঁচ মিনিটে বুঝে নিলেন। পরীক্ষায় উত্তর দিয়ে নম্বর পেলেন। স্যার বাহবা দেবে। বাবা-মাও খুশি। আপনি বাতাসে ভাসছেন।
প্রথম ঘটনায় আপনি কোনো লাভ না দেখলেও আমি বলবো তাতেই লাভ বেশি। অংক না মিললেও আপনি যে আধা ঘণ্টা মাথা খাটালেন এটাই আপনার লাভ। এটাই সৃজনশীলতা। সারা জীবন আপনাকে মাথা খাটিয়েই কাজ করতে হবে। আজকে আপনি সমস্যায় পড়লে অন্যের কাছে সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আপনাকেই সমাধান বের করতে হবে। সেটা করার আগে অনেক কিছুর ধারণা নিতে হবে। একান্তই না পারলে অন্যের সহায়তা নিতে হবে।

অনেক বাবা-মা এক সন্তান থাকলে তাকে কিছু করতে দেয় না। খাবার মেখে মুখে তুলে দেয়। কাপড় গুছিয়ে পরিয়ে দেয়। জুতা পরিয়ে ফিতা বেঁধে দেয়। স্কুল ব্যাগ নিজে গুছিয়ে স্কুল পর্যন্ত বহন করে। পারলে হোম ওয়ার্ক নিজে করে দেয়। শুধু চার-পাঁচ বছরের বাচ্চাদের সাথে করছে তা না; ১৫-১৬ বছরের ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রেও অনেক দেখা যাবে। তারা ভাবছে সন্তানের জন্য কতই না খাটছে। কিন্তু ভুলেও একবার ভাবছে না সন্তানের কত বড় ক্ষতি করে ফেলছে। এই সন্তান পরনির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। বড় হয়ে নিজের কাজ নিজে করতে হিমশিম খাবে। মাচিউরিটির অভাবে অনেক ভুল পথে চলে যাবে। কারণ তার ভিত্তিই নড়বড়ে।
আমি আমার ছাত্রদের খুব কম অংকই করে দেই। একটা চ্যাপ্টার করানোর সময় তার ইতিহাস জানিয়ে দেই। বাস্তব জীবনের ব্যবহার দেখাই। কিছু পদ্ধতি শিখিয়ে দেই। এরপর অংক করবে ওরা। আমি শুধু দিকনির্দেশনা দেই। না পারলে আবার বুঝিয়ে দেই। একেবারেই না পারলে করিয়ে দেই। তবে ওদের মাথা খাঁটাতে হবেই।
বাড়ির কাজ দিলে না পারার জন্য বা ভুল করার জন্য বকা দেই না। কেউ চেষ্টা না করলে তাকে বকি। একটা অংক তিন-চার চেষ্টা করে মেলাতে না পারলেও সে প্রশংসার দাবিদার। গতবছর আমার এক ছাত্র আমার বানানো একটা কঠিন অংক ৬ দিনে ১৯ বার চেষ্টা করে সমাধান বের করে ছেড়েছে। এই ৬ দিন ঈদের বন্ধ ছিল। সে আসলে গণিতের মজা পেয়ে গেছে। ঈদে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে যে গণিতের রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো বেশি আনন্দের সেটা সে উপলব্ধি করতে পেরেছে। ছেলেটা তেমন ভালো ছাত্র না। শারীরিকভাবেও অসুস্থ। মাথায় অপারেশন হওয়ার কারণে ক্লাশ নাইনে দুইবার পড়েছে। সুস্থ থাকলে আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তেমন ভালো রেজাল্ট করার কথাও না।
তবে একটা ব্যাপার আমি বলে দিতে পারি এই ছেলেটা জীবনে হার মানবে না। সমস্যা যতই কঠিন হোক, যতবার ভুল হোক।